গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ শুরুর প্রায় তিন বছর হতে চলেছে। এই সময়ে দখলকৃত পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন ও ইরানেও ইসরাইলি সামরিক অভিযান ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তুরস্ক ও আরব বিশ্বের দেশগুলো ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও কার্যকরভাবে তা ঠেকাতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রশ্ন উঠেছে—ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে আর কী করা সম্ভব?
এই বাস্তবতায় গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। চুক্তিটি কেন হলো এবং এর পেছনে কী ধরনের পরিবর্তন কাজ করেছে—তা হয়তো ইতিহাসবিদেরা ভবিষ্যতে বিশ্লেষণ করবেন। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বিশ্লেষণটি তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের ভাষায়, ‘আমেরিকা অবিশ্বস্ত: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি।’
চীনের দৃষ্টিতে এই চুক্তি কেবল একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের উদ্যোগ নয়; বরং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বিপর্যয়ের সরাসরি ফল। চীনা বিশ্লেষক ইয়ান শুয়েতুংয়ের মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে আরব দেশগুলোর মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো বুঝতে শুরু করেছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; নিজেদের সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করতে হবে।
সামরিক শক্তিতে কতটা শক্তিশালী এই জোট?
কাগজে-কলমে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী। তিন দেশের সম্মিলিত নামমাত্র জিডিপি প্রায় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। তাদের হাতে রয়েছে ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি প্রধান যুদ্ধট্যাংক, ১ হাজার ১০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান, বিপুলসংখ্যক ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিশাল সামরিক বাহিনী এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা।
তবে তিন দেশের এই চুক্তির উদ্দেশ্য এক নয়।
পাকিস্তান একদিকে অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে, অন্যদিকে দেশটি একাধিক সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবিলা করছে। একই সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করাও ইসলামাবাদের অন্যতম লক্ষ্য। ভারত ইতোমধ্যে এই চুক্তিকে নিজেদের স্বার্থের জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখেছে।
তুরস্কের প্রয়োজন আরও বিস্তৃত। দেশটি ইসরাইলের হুমকির বিপরীতে ভবিষ্যতে পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহারে নতুন সিরীয় সরকারকে সহায়তা করা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য নতুন বাজার তৈরি করাও আঙ্কারার স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
সৌদি আরবের হিসাবও আলাদা। ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের মোকাবিলায় রিয়াদ একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার চায়। একই সঙ্গে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনাও মধ্যপ্রাচ্যের একের পর এক যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বাধার মুখে পড়ছে।
তবে তিন দেশের স্বার্থের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিন্ন জায়গাটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমছে কেন?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। ইসরাইল ও ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের করা সমঝোতাও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির পরও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত সামনে আনা হয়েছে।
গাজা নিয়েও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। হামাসের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই শর্ত পরিবর্তন করে সব ধরনের অস্ত্র ধ্বংসের কথা বলা হয়। এরপর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটিই প্রত্যাখ্যান করেন।
এতে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষে তেলআবিবের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা ইসরাইলি সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দুর্বলতা নেতানিয়াহুকে আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
ইসরাইলের লক্ষ্য কি শুধু হামাসকে নিরস্ত্র করা?
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন ও তাদের পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছে, হামাস নিরস্ত্র হলে যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইসরায়েল গাজা থেকে সরে যাবে।
কিন্তু ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। গাজা থেকে বড় আকারের ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’ ঘটানোর ধারণা ইসরায়েলি রাজনীতিতে বহুবার উঠে এসেছে। হামাসের পরিবর্তে গাজায় ইসরাইল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়ানো হলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই আশঙ্কার সঙ্গে ১৯৮২ সালের বৈরুতের ঘটনা টেনে আনা হয়েছে।
সেবার লেবানন থেকে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) প্রত্যাহারের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পিএলও চলে যাওয়ার পর সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে। দুই দিনে প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও লেবানিজ বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
এই ঘটনা ফিলিস্তিনি জনগণের স্মৃতিতে আজও গভীর ক্ষত হয়ে আছে। ফলে গাজায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব হয়তো খুব বেশি দেখা যাবে না। চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ইয়েমেনের হুতিদের হামলার মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তাই শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাত থামানো সম্ভব নয়।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই জোট কার্যকর হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক দেশগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পরিসরও ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। এতদিন তাদের নিরাপত্তার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই নির্ভরতার বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা সামনে আসছে।
এই কারণেই মিসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আরব শক্তির এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে কি না, কিংবা ইসরাইল গাজা বা অন্য কোথাও কতটা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারছে—এতেই সীমাবদ্ধ নয়।
মূল প্রশ্ন হলো, আরব ও তুর্কি দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড, জনগণ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে কতটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্য কি আরও এক শতাব্দী বাইরের শক্তি ও ইসরাইলকেন্দ্রিক সংঘাতের চক্রে আটকে থাকবে, নাকি অঞ্চলটির প্রধান শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে সেই চক্র ভাঙবে—মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই প্রশ্নেরই একটি সম্ভাব্য উত্তর হয়ে উঠতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটির সাফল্য নির্ভর করবে এর স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী একটি জোট যদি প্রথম পরীক্ষাতেই ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সরকারই বুঝবে—ইসরাইলকেন্দ্রিক নতুন কোনো সংঘাতের পরবর্তী লক্ষ্য তারাও হতে পারে।


